বিবেকের আয়না—প্রকৃতির পাওনা ও আমাদের দায়

এই বইয়ের এতগুলো পৃষ্ঠা পড়ার পর, এবার একটু থামুন। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে নিজের শেষ কয়েকটা ভ্রমণের কথা মনে করার চেষ্টা করুন। আমরা যখন কোনো বনে বা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নেই, তখন আমরা বলি— “আমি প্রকৃতিকে ভালোবাসি।” কিন্তু আসলেই কি তাই? আমাদের ভালোবাসা কি কেবলই লুটতরাজ, নাকি সেখানে বিনম্র কোনো দানও আছে?

নিজেকে নিচের প্রশ্নগুলো একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন:

আপনি প্রকৃতির সাথে কী কী করেছেন?

  • ক্ষণিক আনন্দ ও চিরস্থায়ী ক্ষত: আপনি কি সেই পর্যটক, যিনি বনের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটা ছিঁড়ে প্রেমিকার খোঁপায় গুঁজে দিয়েছেন? প্রেমটা হয়তো আপনার ঐ মুহূর্তে গভীর হলো, কিন্তু একবারও কি ভেবেছেন—আপনার ছিঁড়ে ফেলা ঐ ফুলটার ঘ্রাণে হয়তো রাতে আরও দুটো পোকা বেশি আসতো, আর সেই পোকা খেতে অন্য দুটি প্রাণীর সমাগম হতে পারতো? আপনার এক মুহূর্তের রোমান্টিকতা প্রকৃতির একটি জৈবিক চক্রকে থামিয়ে দিয়েছে।
  • হিরো সাজার নেশা: প্রেমিকা বা বন্ধুদের কাছে নিজেকে ‘হিরো’ প্রমাণ করার জন্য আপনি কি সেই নিরীহ বানরটার পিছনে ধাওয়া করেছিলেন? কিংবা কোনো সাপ দেখে অহেতুক লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাকে মেরে রক্তাক্ত করেছিলেন? মনে রাখবেন, আপনি বনের মেহমান ছিলেন, আর তারা ছিল ঐ ঘরের মালিক।
  • শব্দের তান্ডব: বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে আপনি কি উচ্চস্বরে মোবাইলে বা স্পিকারে গান বাজিয়েছেন? একবারও কি আপনার মনে হয়েছে, এই বিকট শব্দের প্রভাবে কিছু প্রাণী চিরতরে এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পারে? আপনি যে প্রাণীটাকে দেখে আজ নৈসর্গিক আনন্দ পেলেন, আপনার সেই আদরের সন্তান বা ভাগ্নী কি ভবিষ্যতে এই বনে সেই প্রাণীটাকে আর দেখতে পাবে?
  • অসতর্কতার আগুন: আপনি কি আপনার সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরোটি বনের শুকনো পাতার স্তূপে অবহেলায় ফেলে এসেছেন? আপনার সেই এক মুহূর্তের অসতর্কতা হয়তো পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারতো মাইলের পর মাইল অরণ্য আর হাজারো নাম না জানা প্রাণীর সংসার। হয়তোবা করেছেও, কেউ আর খেয়াল করে দেখেননি, সবচেয়ে বড়কথা আমাদের প্রকৃতি তো আর মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারেনা।

মূত্র ত্যাগ: ‘হিসু’ চাপাটা মোটেও মানুষের নিজের ইচ্ছার উপর নির্ভর করেনা। তবে আমরা চাইলেই ’হিসু’ বিসর্জনের নীতিমালায় সামান্য পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করে একটা নিরাপদ ও পর্দাবেষ্টিত স্থানে পরিমিত মাত্রাবোধের মধ্যে থেকে ’হিসু’ বিসর্জন বা মূত্রত্যাগ করতে পারতাম। কিন্তু আমরা যেকোনো গাছের আড়ালকে নিরাপদ পর্দা হিসেবে বিবেচনা করে আমাদের প্রকৃতিপ্রদত্ত অধিকার প্রয়োগ করতে শুরু করি। এই অপরিণামদর্শিতার ভয়াবহ পরিণামে একসময় আমরা ঐ আড়ালদাতা গাছকেই হারিয়ে ফেলছি। আপনি কি তাহলে ঐ আড়ালদাতাকে হত্যার অন্যতম সহযোগী?

  • আবর্জনার পাহাড়: চিপসের প্যাকেট কিংবা খালি পানির বোতলটা কি বনের মধ্যে ছুড়ে ফেলে এসেছেন? একবারও কি চিন্তা করেন নাই যে, দিনে যদি ১০০০ পর্যটক আপনার মতো ১০০০টি প্যাকেট বা বোতল ফেলে, তবে সেই বনের ফুসফুস কীভাবে বন্ধ হয়ে যায়? ১০০০টি পলিথিনের প্যাকেট এলোমেলো করে রেখে দেখেছেন কখনও কতটুকু জায়গা দরকার হয়?

প্রকৃতির কোনো বাক্স নেই

আমরা মসজিদে যাই, নামাজ শেষে সওয়াবের আশায় দানবাক্সে টাকা দিই। মন্দিরে যাই, ভক্তিভরে প্রণামীর বাক্সে টাকা দিয়ে আসি। ট্রেনে ভ্রমণে বের হলে কোনো ভিখারি বা অন্ধ গায়ককে টাকা দিই। কারণ সেখানে চাওয়ার লোক আছে, সেখানে একটি ‘বাক্স’ আছে। প্রতিদিন ঢাকাবাসী মানুষ সকালবেলা কাজে রওয়ানা দিয়ে কোনো মোড়ে থালা নিয়ে বসে থাকা কোনো ভিখারী দেখেননি এমন দৃশ্য কল্পনায়ও প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু প্রকৃতি? প্রকৃতি যে আমাদের নিকট একটি বীজের দাবি রাখে, সেটা কি আমাদের কখনও মনে হয়েছে? হয়নি। কারণ প্রকৃতি কোথাও কোনো ‘সালামী বাক্স’ রাখেনি। প্রকৃতি কখনও আপনার কাছে এসে হাত পাতেনি। আর হাত পাতেনি বলেই কি আমরা শুধু নিয়ে যাবো? কিছুই কি ফেরত দেব না?

বিনিময়ে আপনি কী দিয়েছেন?

প্রকৃতি আপনাকে দিয়েছে বিশুদ্ধ অক্সিজেন, মানসিক প্রশান্তি, আর জীবনের ক্লান্তি দূর করার এক বিশাল ক্যানভাস। অথচ আপনি যখন সেই বন থেকে বের হয়ে এসেছেন, বিনিময়ে তাকে কী দিয়ে এসেছেন? একগাদা ছবি আর ভিডিও ছাড়া প্রকৃতিকে দেওয়ার মতো কি কিছুই ছিল না আপনার ব্যাগে?

নিজের বিবেকের আয়নায় নিজেকে একবার দাঁড় করান এবং প্রশ্ন করুন— আমি এই প্রকৃতিকে কী দিয়েছি?”

এখনই সময় ঋণ শোধের…

আপনি প্রকৃতির সাথে যা করেছেন, তা হয়তো আর মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু আজ থেকে আপনি যা করবেন, তা বদলে দিতে পারে আগামীর চিত্র। প্রকৃতি আজ আপনার কাছে হাত পেতেছে, তবে টাকার জন্য নয়—একমুঠো বীজের জন্য। আপনার পরবর্তী ভ্রমণে যখন আপনি একমুঠো বীজ সাথে নেবেন, তখন আপনার আগের সব ভুলের জন্য প্রকৃতির কাছে হবে সেটি একটি নীরব ‘ক্ষমা প্রার্থনা’ ও ‘প্রণামী’। আসুন, লুণ্ঠনকারী নয়, আমরা প্রকৃতির ‘ঋণদাতা’ হই।

Related posts

Leave a Comment