পর্যটনের ক্ষত—সংকটে বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

পর্যটন একটি দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্য আশীর্বাদ হলেও, অনিয়ন্ত্রিত এবং অসচেতন পর্যটন আমাদের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের (Ecosystem) জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণের ফলে জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতিগুলো হচ্ছে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. আবাসস্থল ধ্বংস ও বনের সংকোচন

পর্যটকদের আবাসন ও যাতায়াতের সুবিধা দিতে গিয়ে বনের গভীরে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে, রিসোর্ট বানানো হচ্ছে। এতে বনের অখণ্ডতা নষ্ট হচ্ছে। একে বলা হয় ‘Habitat Fragmentation’। যখন একটি বড় বন খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়, তখন বন্যপ্রাণীরা তাদের চলাচলের পথ হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে লাউয়াছড়া বা সাতছড়ির মতো বনে বানর বা হনুমান এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাওয়ার নিরবিচ্ছিন্ন পথ পায় না, যার ফলে তারা প্রায়ই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় অথবা রাস্তায় গাড়ির নিচে পড়ে প্রাণ হারায়।

২. খাদ্যের অভাব ও বন্যপ্রাণীর স্বভাব পরিবর্তন

পর্যটকরা শখের বশে বন্যপ্রাণীদের চিপস, বিস্কুট বা ভাজাভুজির মতো কৃত্রিম খাবার দেয়। এর ফলে দুটি ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে:

  • পুষ্টিহীনতা: বনের প্রাণীদের শরীর মানুষের প্রক্রিয়াজাত খাবার হজম করার উপযোগী নয়, যা তাদের অসুস্থ করে তোলে।
  • স্বভাব পরিবর্তন: প্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক শিকার বা খাবার খোঁজার দক্ষতা হারিয়ে ফেলে এবং মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যখন তারা পর্যটকদের কাছে খাবার পায় না, তখন তারা লোকালয়ে হানা দেয়, যা মানুষ ও বন্যপ্রাণীর দ্বন্দ্ব (Human-Wildlife Conflict) বাড়িয়ে দেয়।

৩. শব্দ দূষণ ও প্রজনন ব্যাহত হওয়া

বনের শান্ত পরিবেশ বন্যপ্রাণীদের প্রজনন ও বিশ্রামের জন্য অপরিহার্য। পর্যটকদের উচ্চস্বরে গান বাজানো, চিৎকার এবং যানবাহনের হর্ন বনের প্রাণীদের মধ্যে প্রচণ্ড মানসিক চাপ (Stress) সৃষ্টি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত শব্দের কারণে অনেক পাখি তাদের বাসা ছেড়ে চলে যায় এবং অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী ভয়ের কারণে স্বাভাবিক প্রজনন করতে পারে না।

৪. প্লাস্টিক ও বর্জ্যের বিষাক্ত ছোবল

আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষত হলো প্লাস্টিক দূষণ। পর্যটকদের ফেলে আসা প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট এবং পলিথিন মাটির গভীরে গিয়ে গাছের পুষ্টি শোষণ বাধাগ্রস্ত করে। অনেক সময় হরিণ বা অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণী এই প্লাস্টিক খেয়ে ফেলে, যা তাদের পাকস্থলীতে আটকে গিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

৫. উদ্ভিদের বৈচিত্র্য হ্রাস

অজস্র পর্যটকের পায়ের চাপে বনের ওপরের স্তরের মাটি শক্ত হয়ে যায়। একে বলা হয় ‘Soil Compaction’। এর ফলে বনের নতুন চারা বা অংকুরোদগম হতে পারে না। এছাড়া পর্যটকরা শখের বশে দুর্লভ অর্কিড, ফুল বা লতাগুল্ম ছিঁড়ে ফেলে, যা ধীরে ধীরে ঐ এলাকার নির্দিষ্ট প্রজাতির উদ্ভিদকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যায়।

৬. জলাশয়ের দূষণ

বাংলাদেশের অনেক পর্যটন কেন্দ্র ঝরনা বা নদী কেন্দ্রিক। পর্যটকদের ব্যবহৃত সাবান, শ্যাম্পু এবং অন্যান্য রাসায়নিক পানির pH মাত্রা বদলে দেয়। এতে পানিতে থাকা মাছ, ব্যাঙ এবং ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীরা অক্সিজেন সংকটে পড়ে মারা যায়, যা পুরো জলজ বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করে দেয়।

উপরের এই ক্ষতিগুলো কোনোটিই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটির সাথে অন্যটি জড়িত। একটি গাছ মারা যাওয়া মানে একটি পাখির বাসা হারানো, আর একটি পাখির বাসা হারানো মানে বনের বীজ বিস্তারের একটি মাধ্যম হারিয়ে যাওয়া। এই চক্রাকার ধ্বংসযজ্ঞ রুখতেই প্রকৃতির দাবী” আন্দোলনের জন্ম। আমাদের পর্যটনকে কেবল ‘উপভোগের মাধ্যম’ নয়, বরং ‘পুনর্গঠনের মাধ্যম’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

Related posts

Leave a Comment